আমরা অনেকেই ছোটবেলায় কথায় কথায় বকা বা মার খেয়ে বড় হয়েছি। তাই বাবা-মা হওয়ার পর আমরা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি—"আমার সন্তানের গায়ে আমি কখনো হাত তুলব না, ওকে বকা দেব না।" আমরা ইন্টারনেট ঘেঁটে 'জেন্টল প্যারেন্টিং' (Gentle Parenting) শেখার চেষ্টা করি।

কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? বাচ্চা হয়তো দোকানে খেলনার জন্য মাটিতে শুয়ে চিৎকার করছে, আর মা-বাবা অসহায়ভাবে বলছেন, "বাবু প্লিজ কেঁদো না, আচ্ছা নাও কিনে দিচ্ছি।" কিংবা বাচ্চা রাগের মাথায় মাকে চড় মারছে, আর মা হাসিমুখে বলছেন, "আম্মুকে মারে না বাবা, এটা ব্যাড ম্যানার।"

মারধর না করা মানেই কি জেন্টল প্যারেন্টিং? আধুনিক চাইল্ড সাইকোলজি বলছে—একেবারেই না! এটি জেন্টল প্যারেন্টিং নয়, এটি হলো পারমিসিভ প্যারেন্টিং (Permissive Parenting) বা সহজ বাংলায় 'লাই দেওয়া'।

মানারাহ একাডেমির আজকের এই বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলে আমরা জানবো, এই দুই পদ্ধতির সূক্ষ্ম পার্থক্য কোথায় এবং কীভাবে 'স্নেহ' দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছি।


ভুলটা কোথায় হচ্ছে? (The Confusion)

আমরা যখন আমাদের বাবা-মায়েদের 'টক্সিক' বা কঠোর শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তখন পেন্ডুলামের মতো আমরা একদম বিপরীত দিকে চলে যাই। আমরা ভাবি, বাচ্চাকে 'না' বলা যাবে না, বাচ্চার চোখে পানি আসতে দেওয়া যাবে না।

কিন্তু সাইকোলজি বলছে, বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের জন্য শুধু 'ভালোবাসা' (Warmth) যথেষ্ট নয়, তাদের সুস্থ 'সীমানা' বা বাউন্ডারি (Boundaries) প্রয়োজন।

পারমিসিভ প্যারেন্টিং (লাই দেওয়া)

এখানে ভালোবাসা আছে ১০০%, কিন্তু কোনো নিয়ম বা সীমানা নেই (০%)। বাবা-মা বাচ্চার কান্নার ভয়ে সব আবদার মেনে নেন।

জেন্টল প্যারেন্টিং (সঠিক শাসন)

এখানে ভালোবাসা আছে ১০০%, এবং সেই সাথে সীমানা ও নিয়মও আছে ১০০%। বাবা-মা বাচ্চার আবেগকে সম্মান করেন, কিন্তু ভুল আচরণকে প্রশ্রয় দেন না।


লাই দেওয়ার (Permissive Parenting) ভয়ংকর পরিণতি কী?

যেসব বাবা-মা সন্তানের সব জেদ মেনে নেন, তারা হয়তো সাময়িকভাবে বাচ্চার কান্না থামিয়ে শান্তি পান। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল হয় মারাত্মক:

  • ইমোশনাল রেগুলেশনের অভাব যে শিশু কখনো 'না' শোনেনি, সে বড় হয়ে বাইরের পৃথিবীতে (স্কুল, কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে) কারও 'না' সহ্য করতে পারে না। সামান্য প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশনেই তারা ভেঙে পড়ে বা ডিপ্রেশনে ভোগে।
  • এনটাইটেলমেন্ট (Entitlement) এরা মনে করে পুরো পৃথিবী তাদের চারপাশে ঘোরে এবং সবাই তাদের আবদার মেটাতে বাধ্য।
  • চরম অ্যাংজাইটি (Anxiety) বাচ্চারা আসলে নিয়ম পছন্দ করে। নিয়ম তাদের মনে নিরাপত্তা দেয়। যখন তারা দেখে পরিবারে কোনো নিয়ম নেই, বাচ্চার জেদেই সব চলে—তখন তারা নিজেদের অরক্ষিত (Insecure) ভাবে। কারণ তাদের কোনো 'শক্তিশালী লিডার' বা গাইড নেই।

পার্থক্য বুঝুন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে (Real-Life Scenarios)

ধরা যাক, পার্ক থেকে বাসায় ফেরার সময় হয়েছে, কিন্তু আপনার বাচ্চা কিছুতেই ফিরবে না। সে কান্না আর চিৎকার শুরু করলো। তিন ধরনের প্যারেন্টিংয়ের পার্থক্য খেয়াল করুন:

🚫 টক্সিক বা কঠোর শাসন
"চুপ করো! একদম কাঁদবে না। আমি বলেছি এখন যাব, মানে এখনই যাব। চলো বলছি!"

(এখানে বাচ্চার আবেগের কোনো দাম নেই)

⚠️ পারমিসিভ বা লাই দেওয়া
"আচ্ছা বাবা কেঁদো না প্লিজ। ঠিক আছে, আর মাত্র ৫ মিনিট খেলো। এরপর কিন্তু সত্যি চলে যাব।"

(এখানে বাবা-মা বাউন্ডারি ধরে রাখতে পারলেন না, বাচ্চার জেদের কাছে হেরে গেলেন)

✅ জেন্টল প্যারেন্টিং
"আমি জানি তুমি আরও খেলতে চাও। পার্ক থেকে যেতে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? কিন্তু আমাদের বাসায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। তুমি কি নিজে হেঁটে গাড়িতে যাবে, নাকি আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে যাব?"

(আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া + বাউন্ডারি + নিয়মের মধ্যে থেকে অপশন দেওয়া)

বাচ্চা এরপরও হয়তো কাঁদবে। জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের উদ্দেশ্য বাচ্চার কান্না থামানো নয়। উদ্দেশ্য হলো—বাচ্চাকে এটা বোঝানো যে, "তোমার কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু নিয়মটা পরিবর্তন হবে না।"

সঠিক 'জেন্টল প্যারেন্টিং' চর্চার ৩টি মূলমন্ত্র

আপনি যদি সত্যিই সন্তানকে মানসিক ও আবেগিকভাবে সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়তে চান, তবে নিচের ৩টি রুল মেনে চলুন:

আবেগকে 'হ্যাঁ' বলুন, আচরণকে 'না' (Validate emotion, stop behavior)

বাচ্চা রেগে গিয়ে খেলনা ছুঁড়ে মারলে তাকে বলুন, "আমি বুঝতে পারছি তুমি খুব রেগে আছো। রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমি তোমাকে জিনিস ছুঁড়ে মারতে দেব না। এতে অন্যের ব্যথা লাগতে পারে।" এরপর খেলনাটি সরিয়ে নিন।

ধারাবাহিকতা (Consistency is Key)

আজ মন ভালো থাকলে বাচ্চাকে চকলেট দিলেন, আর কাল মন খারাপ থাকলে ধমক দিলেন—এমনটা করা যাবে না। আপনার 'না' যেন সবসময় 'না'-ই থাকে। বাচ্চার কান্না দেখে যদি আপনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলান, তবে বাচ্চা শিখে যাবে যে—কান্নাই হলো তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

আপনি বাচ্চার বন্ধু নন, আপনি তার 'প্যারেন্ট'

অনেক বাবা-মা গর্ব করে বলেন, "আমি আমার বাচ্চার বন্ধু।" কিন্তু বাচ্চার অনেক বন্ধু আছে, তার একজন 'বাবা' বা 'মা' প্রয়োজন। এমন একজন লিডার প্রয়োজন, যে ঝড়ের সময় (বাচ্চার ইমোশনাল মেল্টডাউনের সময়) শান্ত থেকে তাকে সঠিক পথ দেখাবে।

পরিশেষে

জেন্টল প্যারেন্টিং কোনো সহজ কাজ নয়। এটি সবচেয়ে কঠিন প্যারেন্টিং। কারণ এখানে বাচ্চার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে, বাবা-মাকে নিজেদের আবেগ, রাগ এবং অধৈর্য হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

আপনার কাজ সন্তানকে সবসময় খুশি রাখা নয়; আপনার কাজ হলো তাকে পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করা। তাই ভালোবাসুন নিখাদভাবে, কিন্তু নিয়মগুলো স্থাপন করুন শক্তভাবে।